একটা সময় ছিল এমনটা দেখা যেত, বাবার সাথে ঝগড়া করে ছেলেটা রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। দু’দিনের জন্য হয়ত বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠতো। কিংবা কক্সবাজার ঘুরতে চলে যেত। অন্যদিকে ছেলের পরিবার খবর কাগজে নিখোঁজ বিজ্ঞাপন দিত। তাতে লেখা থাকত, “জলদি ফিরে আসো বাবা, তোমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ইতি তোমার পরিবার”। সপ্তাহখানেক পেরিয়ে গেলে পুলিশ ছেলেটার বাড়ি গিয়ে হারিয়ে গেছে বা ছেলে ধরার খপ্পরে পড়েছে এরকম অভিযোগের ভিত্তিতে একটা জিডি করত। একসময় অভিমান ভেঙ্গে ছেলে ঘরে ফিরত। মা-বাবা, ভাই-বোন তখন তাকে জড়িয়ে ধরতো। মা ছেলে ফেরা উপলক্ষে বিরিয়ানী রেঁধে পাড়া পড়শীকে খাওয়াতো। চাচা ফুপু, মামা খালারা আদর করে ঈদের মতন বকশিস দিত তারপর বলতো, “এমন পাগলামী আর করবি না”। দাদা-দাদী, নানা-নানী তখন বাবা-মা’কে বকতে থাকত, “আরেকবার যদি আমার নাতিকে কিছু বলছো, তোর ঠাং ভেঙ্গে দিবো”। নাতি খুশী হয়ে যেত। বাবা-মা খুশী। সবাই খুশী। সারা বাড়ি তখন উৎসবমুখর। এভাবে চলতো ভালবাসা আর মান অভিমানের হিসাব নিকাশ মেলানোর পর্ব। সবাই মিলে সব কিছু আগের মতন স্বাভাবিক করে দিত।

আর আজকাল কেউ বাড়ি ছাড়লে সবাই আগেভাগে ধরে নেয়, ‘জঙ্গী হয়ে গেছে’। আজকাল এত জন বাড়ি ছাড়ছে কেউ নিখোঁজ বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে না। কেউ জানতেও চাচ্ছে না কেন এমনটা হচ্ছে। তারপর পুলিশের হেনাস্তা বেড়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া সন্তানের পরিবারকে এক ঘরে করে ফেলা হয়। সবাই তাদের কুনজরে দেখতে শুরু করে দেয়। পাড়া প্রতিবেশিরা বলতে শুরু করে দেয়,”ঐ যে দ্যাখ জঙ্গী পরিবার”। তখন সেই পরিবারের মানসিক অবস্থা কি দাঁড়ায় তা বর্ণনা করা যায় না। একে তো সন্তানহারা, অন্যদিকে অপবাদ।

আজ যদি কোন ছেলে বা মেয়ে ভুল বুঝে ফিরে আসে, তাহলে কি হবে পরিস্থিতি। হয়ত পাড়া প্রতিবেশীরা গণপিটুনি দিবে তারপর পুলিশ ভ্যানে তুলবে তারপর থানায় নিয়ে যাবে এবং তাকে গ্রেফতার দেখাবে জঙ্গী বলে, আটক রেখে প্রেস কনফারেন্স ডাকবে। তারপর মিডিয়া ছুটে আসবে গল্প বানাতে। তারপর রিমান্ড, জেল। শেষমেষ একদিন ছেলেটা বা মেয়েটার কথা সবাই ভুলে যাবে। হঠাৎ একদিন সেই ছেলেটা বা মেয়েটাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে পুলিশ বের হবে তাদের গুরুকে খুঁজতে। তারপর খুঁজে না পেয়ে সেই ছেলেকে বা মেয়েকে বন্দুক যুদ্ধে ফেলে দিবে। তারপর লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। পরেরদিন আবার খবরের শিরোনাম, “ক্রসফায়ারে জঙ্গী নিহত”।

এক সময় হারিয়ে যাওয়া একটি ছেলে মেয়েকে ফিরে আনতে সমাজ সবসময় বিধ্বস্ত পরিবারের পাশে থাকত আর আজ আরো বিধ্বস্ত করে।

বিদেশে অপরাধী সংশোধনালয় আছে যেখানে অন্ধকারে থাকা মানুষগুলো আলো খুঁজে পায়। আর আমাদের দেশে মৃত্যুকূপই একমাত্র সমাধান।

#অ_আ_এলোমেলো_চিন্তা

Share

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »